লেখকঃ স্বর্না আক্তার।
রেললাইনের পাশের বস্তিতে চায়ের দোকান ছিল রফিক আর সেলিনার। ভোর ৫ টায় উঠে রফিক কেটলি বসাতো, সেলিনা পাউরুটি সেঁকতো। দিনে ৩০-৪০ টাকা। এই টাকাতেই দুই মেয়ে, এক ছেলের সংসার চলতো।
সবচেয়ে বড় মেয়ে আফিয়া। বয়স ১৬ বছর,
স্কুলে পড়াশোনা করতে খুব ভালোবাসতো। কিন্তু বাবার অসুখের পর আর পড়াশোনা করা হলো না। “আফিয়া, তুমি একটু কষ্ট করো। ২-৩ বছর পর তোমার ছোট ভাইবোনদের পড়াবো,” মা বলেছিল।
তাই আফিয়াকে দেওয়া হলো শহরের ধনী এক বাসায় কাজে। মাসে ৪ হাজার টাকা, দুই বেলা খাবার। প্রথম ৪ মাস ফোনে শুধু বলতো, “মা, ভালো আছি। খালাম্মা ভালো।”
তারপর হঠাৎ ১৫ দিন কোনো খবর নেই।
মেয়ের কোন খোঁজখবর না পেয়ে।
সেলিনা ফোন দিল, ওপাশ থেকে শোনা গেল কাঁপা গলা: “আপা মনি… আফিয়া কেমন আছে,? আফিয়া কোথায়? তখন বাড়ির মালিকের উত্তর ও আর কাজে আসে না।”
“কেন? অসুখ করছে?”
“না বাজার থেকে ফেরার সময়…
পথে এক কাঠমিস্ত্রি… অরে টেনে নিয়ে গেছে গুদামে…” বাকিটা কান্নায় ডুবে গেল।
সেলিনার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। রফিক দৌড়ে গেল সেই বাসায়। বাড়ির মালিক ভ্রু কুঁচকে বলল, “আমি কি করব? আমার তো কোনো দোষ নাই। পুলিশে গেছো?”
“গেছিলাম ভাই। ওরা বলে, প্রমাণ নাই, কেস নিবে না। বলে মেয়ে নাকি আগেও এমন করছে। আমার মেয়ে তো ঘর থেকে বেরই হইতো না!”
থানায় ৩ দিন ঘুরেছে। একবার বলে ডাক্তারি রিপোর্ট লাগবে, আরেকবার বলে আসামি নাই। আসামি গ্রামে পালিয়ে গেছে। যে টাকা খরচ করে উকিল ধরবে, সেই টাকাই নাই।
হাইরে দুনিয়া!
যার কাছে টাকা নাই, তার জন্য আইন শুধু কাগজ। যার টাকা আছে, তার জন্য আইন দরজা খুলে দেয়।
আফিয়া আর আগের মতো হাসে না। রাতে চমকে ওঠে। সেলিনা রাতে মেয়ের মাথায় হাত বুলায় আর নিজেকে দোষ দেয়: “আমার গরিব হওয়াটাই কি ওর অপরাধ?”
পাশের ঘরের রোজিনা আপা, যিনি এনজিওতে কাজ করেন, সব শুনে বললেন, “চুপ করে থাকলে ওরা আরও সাহস পাবে। আমি মহিলা আইনজীবীর সাথে কথা বলেছি। উনি বিনা পয়সায় কেস লড়বে।”
আফিয়া প্রথমে ভয় পেয়েছিল। কিন্তু একদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “মা, আমি চুপ থাকবো না। আমার মতো আর কোনো মেয়ের সাথে যেন এমন না হয়।”
কেসটা আবার তোলা হলো। মিডিয়া আসলো। মানুষ জমা হলো থানার সামনে। এবার পুলিশ নড়েচড়ে বসল। আসামি ধরা পড়ল।
আফিয়া জানে, যা হারিয়েছে তা আর ফিরবে না। কিন্তু সে ঠিক করেছে, সুস্থ হলে মেয়েদের জন্য একটা ছোট সেলাই সেন্টার খুলবে। নাম দেবে “আলো”।
কারণ অন্ধকার যতই গভীর হোক, একটা ছোট মোমবাতিও রাত কাটিয়ে দিতে পারে।
